করোনা প্রভাবে বৈশ্বিক এলএনজি উৎপাদন কমার আশঙ্কা

চীন থেকে বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস। ভাইরাসটির বিস্তার রোধে দেশে দেশে শুরু হয় লকডাউন। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে লকডাউনের প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে জ্বালানি পণ্যের বাজার। জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক গ্যাস, জেট ফুয়েলসহ সব পণ্যের চাহিদা রেকর্ড কমেছে।

করোনার জেরে প্রাকৃতিক গ্যাসের বৃহত্তম বাজার এশিয়ায় পণ্যটির চাহিদা ব্যাপক কমেছে। ফলে রেকর্ডহারে কমেছে পণ্যটির দামও। খাতসংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, দামের রেকর্ড পতনের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির উৎপাদন কমিয়ে আনতে বাধ্য হতে পারে শীর্ষ উৎপাদকরা।

মহামারীর সংক্রমণ রোধে বিশ্বব্যাপী গৃহীত ব্যবস্থায় বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, উষ্ণায়ন, রান্নাবান্না, যানবাহন ও কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচার—সব খাতেই প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা কমেছে। ফলে বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি বাজার জাপান, চীন, উত্তর কোরিয়া ও ভারতে চলতি বছর জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

এলএনজির বাজার পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি পণ্যটির দামের ওপর। জ্বালানিটির দাম কমতে কমতে ইতিহাসের সর্বনিম্নে গিয়ে ঠেকেছে। এশিয়ার বাজারে সর্বশেষ সপ্তাহে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট এলএনজির দাম কমে ১ ডলার ৮৫ সেন্টে নেমেছে, যা পণ্যটির এ যাবৎ কালের সর্বনিম্ন দাম। চাহিদা কমে বাজারে উদ্বৃত্ত এলএনজির সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দামের এমন অপ্রত্যাশিত পতন ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানি বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক অ্যালেক্স ডিওয়ার বলেন, প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল এলএনজির দাম ২ ডলারের নিচে নেমে গেলে উৎপাদকের পক্ষে পণ্যটির উৎপাদন খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে বাজার পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে বেশকিছু উৎপাদক অচিরেই পণ্যটির উৎপাদন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারেন।

এমনকি যেসব দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির একটু উন্নতি হয়েছে। সেসব দেশের বাজার ব্যবস্থাও এখনো স্বাভাবিক হয়নি। চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। তবে ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে সংযত নীতির কারণে দেশগুলোতে এখনো পণ্য আমদানি-রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্য হ্রাস সমস্যাটি আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর। এপ্রিলে আন্তর্জাতিক বাজারে আদর্শ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে দুই দশকের সর্বনিম্নে নেমে গিয়েছিল। যা ২০১৯ সালের শেষের দিকের তুলনায় অর্ধেক।

এশিয়ার দেশগুলো, যারা এলএনজি মোট বৈশ্বিক রফতানির ৭০ শতাংশের ভোক্তা, এখনো দেশগুলো বেশির ভাগ এলএনজি ক্রয় করে জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম হ্রাস এ অঞ্চলে এলএনজির দাম কমাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

নরওয়েভিত্তিক জ্বালানি পণ্য বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্টেড এনার্জিও আশঙ্কা করছে, চলতি বছর এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদা প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ব্যাপকহারে কমে আসতে পারে। এ বছর পণ্যটি বৈশ্বিক চাহিদা ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৩৫ কোটি ৯০ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। ২০১৯ সালে যেখানে এলএনজির বৈশ্বিক চাহিদা প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ শতাংশ। যদিও জলবায়ু ও আবহাওয়াগত পরিবর্তন এবং লকডাউনের স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করছে এ বছর জ্বালানি পণ্যটির প্রকৃত বৈশ্বিক চাহিদার রদবদল।

বিসিজির অ্যালেক্স ডিওয়ার জানান, ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস তরলায়ন সক্ষমতার পতন ঘটেছে। বেশকিছু এলএনজি পরিবাহী কার্গোর ক্রয়াদেশ ফিরিয়ে নিয়েছে ক্রেতারা।

লন্ডনভিত্তিক অর্থবাজারের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রিফিরিটিভের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্লান্টগুলোতে এলএনজি উৎপাদন কমে দৈনিক গড়ে ৮১০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। যেখানে ফেব্রুয়ারিতে দেশটি দৈনিক গড়ে ৮৭০ কোটি ঘনফুট এলএনজি উৎপাদন করেছিল। দেশটি থেকে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুতহারে কমছে এবং এ ধারা বছরের আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী জুনে সরবরাহ করা চুক্তির প্রায় ২০টা কার্গোর ক্রয়াদেশ বাতিল করে দিয়েছে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক এলএনজি কোম্পানি চেনিয়ের এনার্জি আশঙ্কা করছে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি চাহিদা ৩০ শতাংশের মতো হ্রাস পাওয়ায় চলতি ও আগামী বছরে এলএনজি খাতে বিশ্বব্যাপী নতুন প্রকল্পের বিনিয়োগ রেকর্ড হারে কমে যেতে পারে।

মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস ইতিমধ্যে এলএনজির উৎপাদন কমিয়ে এনেছে। একই পথে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি রয়্যাল ডাচ শেলও। ফেব্রুয়ারিতে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক কোম্পানিটি এলএনজির উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। তারা পুনরায় কবে কার্যক্রমে ফিরবে তাও অনেকটা অনিশ্চিত। তবে কোম্পানি দুটি অফিসিয়ালি এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

 

খবর: রয়টার্স ও অয়েলপ্রাইসডটকম

Spread the love

অনলাইন ডেস্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Next Post

লাফার্জহোলসিমের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ

রবি মে ১০ , ২০২০
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড চলতি হিসাববছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি’২০-মার্চ’২০) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার (৭ মে) অনুষ্ঠিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ওই প্রতিবেদন অনুমোদনের পর তা প্রকাশ করা হয়। কোম্পানি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি’২০-মার্চ’২০) কোম্পানিটি ৫২ কোটি ২৪ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। গত […]