মাহমুদ মিটুলের পাঁচটি কবিতা


আজ বরং যাই

আমি বরং আজ যাই।
অন্য কোনো দিন
আসবো পোশাকে চড়ে
বাহুবল রথে।

এখানে দারুণ ভিড়।
গোলচত্বরে এসে মিশেছে
সুদীর্ঘ সমাজ সারি,
হই হই গীতে
বিপরীত দাবি-দাওয়া।

ব্যস্ত, বেজায় ব্যস্ত বাজার।
আমি বরং পরে আসি।
পিপীলিকা পথঘাট,
কফিমগ, চায়ের চামচ,
শড়ির শোরুম আর
মাংসের দোকান
ক্লান্ত হলে,

কিছুটা ক্লান্ত হয়ে
যখন নামবে নিরব
মনের খোলনচলে
জমবে অবসন্ন অবসর,
তখন তিমির ডাক
ভীতি বিবসনা,
আসবো আড়াল করে
ভূতের ভেলকি বাজি,
গিলে নেবো এক শ্বাসে
কোকের বোতল।

স্টেশন, টার্মিনাল,
লোকাল সার্ভিস,
অনলাইন অফলাইন জট
কমলে কিছুটা,
কাউকাউ কড়াকাড়ি
বারোয়ারি মেজবান
ক্লান্ত হলে,

কিছুটা ক্লান্ত হয়ে
নামলে ঝিঁঝির রব
বিরাণ বাতাসে দম নিতে
আসবো হৃদয়ে চড়ে
মনোবল রথে-
আজ, আমি বরং যাই।


মৃদু আঁচে জ্বলে

নদীর নিনাদ কানে
বাজে-তরঙ্গালয়ে
ছুটিয়ে ঢেউয়ের তুবরি,
তুখোর সাঁতার কাটছে
যৌবন। তীরচারি ঝাউবন
বিহ্বল বাতাসে হেলেদুলে
খেলছে ফুলটোকা।

বকুল, হেনা, শিমুল,
পলাশের মায়ামুখ ছেনে
লাবণ্য নির্যাসে
বিকেলটাকে পান ক’রে,
সেঁজুতি সন্ধ্যার
হোতা খালকূলে
কাঁশবনে জ্বালিয়ে জোনাকি,
দৈব-দীক্ষালয়ে নাচের তালিম নেয়।

পৌষের পিছু নেয়,
চুপিচুপি হৈমন্তী হাওয়ায়
শোনে শিখামন্ত্র,
মৃদু আঁচে জ্বালিয়ে আবেগ
ধীরে ধীরে মোরব্বা বানায়।
দুঃখের বাতুল বায়ু উড়িয়ে
আউলা বিলে বিভোর মালসায়
খোঁজে সম্ভাবনার কবিরাজী।

মৃদু আঁচে জ্বলে
তরকারি,
চুপিচুপি হৈম হাওয়া
লবণ চেখে দেখে-
ঝিরিঝিরি বরষায়
কদমের বনে
চুরি হয়েছে রোজকার বাঁশরী।


মনোসংযোগ

বরং ওদেরকে শোনো।
সর্বাঙ্গীন কবিরাজী মজমা,
মুশায়রায় খুঁজে নাও
আতর-লোবান সুখ, গিজগিজ
চাটনি তেঁতুল, লোলে ভাসা
এভিনিউ, স্টেডিয়াম।

দেখবে ধাতুর বিজ্ঞাপন।
আধখোলা পিঠভাঁজে
ধনুকের শিল্পকলা
খুঁজতে খুঁজতে চলে যাবে
লাতিন আমাজনে;
উলঙ্গ নিসর্গে নামতে নামতে
তোমাকে ধাক্কা দিয়ে
জাগিয়ে তুলবে, ‘লাগান, ভাই’,
অকস্মাৎ বিহ্বল তুমি
লাগাতে থাকবে এলোপাথারি
সারা গায়ে ভ্যাসলিন।

তোমার পেটে কৃমি-নাশক
দাওয়াই হয়ে উঠবে
আসমানী দৈবপ্রশ্ন
‘হালাল তো?’
তুমি পাকস্থলি ঘেটে
পিত্তরস যাচাই করতে করতে
পৌঁছে যাবে ওষুধের দোকানে,
হাতে নিয়ে গ্যাসের পিল
হা-করে গিলবে
গিলগমেশের হাঁপানি,
এদিন সেদিক ছুটে
তোমার জীবন হয়ে উঠবে
চমৎকার দৌড়মুখর।

আমরসের টসটসে ফোটা
ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে,
চিবুক ছুঁই ছুঁই তুমি
ধীরে নামতে থাকবে
গন্ডদেশ বেয়ে,
ধীরে বুকের খাঁজে
মুদে আসবে চোখ,
নেমে যাবে
নাভীমুখে চিকচিকে
ঘামের বিন্দুতে বুঁদ হয়ে
আহ্-আহ্- অতিবরে
বিভোর উল্লাসে তুমি
চাটতে চাটতে
পরিষ্কার করবে
খায়েসের কলতানি।

ওদেরকেই শোনো বরং।
ওই যে আকাশলীন
দৃশ্যান্তরে গাইছে
বকমারা কলের গুণগান
পরিযায়ী পাখি;
সেখানে মনোযোগ ঢেলে
তুমি বরং পাখি হয়ে
বাকুম বাকুম নাচনে
মাতিয়ে কলাই ক্ষেত
তুমি পোষা মন
বিকেল রঙের আরশে
কাঁকাতুয়া কলরব শেষ হলে
ফিরে আসো,
ফিরে, ফিরে আসো
আমদানী বিছানায়,
সুখ-স্বপ্ন-ঘুমে
পেয়ে যাবে
আরো কিছু ঝিমুনি আরাম,
আরো এক গৃহদাস
শিৎকার মজমায়
খিস্তি-খেয়াল রতি,
মনকলা বায়োস্কপ।


কর্ম খালি নাই

কাজ নাই।
করোনা উত্তর কালে ক্লান্ত বিছানায়
শুয়ে ভাবছি আগামী।
রাত্রি শেষে নামবে আবার
দিনের দংশন,
আহারে বিহার তাড়া;
কর্মহীন দুর্ভাবনা বুনে
রাঁধি একাকিত্ব, খাই আয়ু খেসারত।

কাজ নাই, নিরলস
খয়রাতি বোলচালে যাপক জীবন,
প্রতিদিন বয়কট, বাছাই ছাঁটাই;
ডালপালা শীত ছুঁই
হলুদ অপেক্ষা বাড়ে, পাতা ঝরে,
বাড়ে বেহায়া জগত দাবি;
প্রতীক্ষা জারিত পাল
বেদম বাজিতে দোলে অহেতুক প্রাণ।

কাজ নাই।
ক্লান্ত পৃথিবীর ভারবাহী দেহধারী
জীব, জীবনের ঘুরপাকে
বাসন আলাপে দিন,
বিছানা ক্ষোভের শোকগাথা সুর করে
গেয়ে, পারাপারে খুঁটে খাই,
নিরামিষ তিন বেলা, আয়ু হাহুতাশ।


খেয়ালের খতিয়ান

আমাকে খুঁজবে তুমি ভুলের ভাঙন
কূলে দিশেহারা প্রাণে, জানি;
কাজল কান্না সুখে হাতরে
স্যুটকেস, পিসি’র ফোল্ডার,
স্মৃতিমগ্ন দক্ষিণ জানালা ধরে
শুনবে বাতাসে স্বর অবিরত
আবাহন, আউলা উদাস সুর,
হট্টিটি পাখির অবিরাম আর্তনাদ।

ইউটিউবে বাজবে পুরনো গান,
লাটিমের ঘূর্ণীতে মগজের
আধাপাকা নিউরনে নড়ে উঠবে
প্রাণ, সুদূর বিরামপুরে ভাব
স্ক্রলবারে হৃদয় মথিত ওঠানামা,
ঘুরপথে কুড়োবে ঝরা অবসাদ।

বাসনে বাজবে গীত, রান্নাবাটি
খেলার খেয়ালে কেটে যাবে
বেজায় দুপুর, বিষাদ বিকেল খুলে
পড়বে মনের ভুলে গায়েবি
গীতাঞ্জলি, আওয়াজে ভারী হলে
মন, হেলেদুলে বেলকনি টবে
গাছের কানে বলবে বিরাণ
স্মৃতি, পাতাছেঁড়া দিনলিপি,
না-খুশি না-ব্যথার ঝিনুকমালা।

অথচ আমার দিন, দূরে খেসারত
খামারে বেগার জিকির তুলে
বেগানা জামিনে ঠেলে দণ্ড লাঙল
চর্যা রোপন করি আগামীর বেদনা;
প্রতিদিন অশ্রু সেঁচে লালন করি
দুঃখের বাদামী চোখে নদী বয়
তরতর ডিঙা পালে রঙ মেখে
মুখশের পাইকারি বাজারে
নিজেকে বেচিকিনি প্রতিদিন।

পড়ে থাকে দূরালাপ দূরবীণ-
আমরা তুমুল তুফান তুলে
অন্তর্জালে তখন সমসত্ব দ্রবণে
পান করি বন্ধ্যা অবসর;
অনলাইন রেসিপি গুণে রাঁধি
স্মৃতির আবছা তরকারি,
ফালি ফালি কেটে বেদনা মূল
রসনা বিলাসে খাই হাওয়াই মিঠাই।

বেলা পড়ে আসবে, সায়াহ্নে শীতল
আলেখ্য পেতে শুয়ে বসে
কাটে না ক্ষণ, কন কন হীম বায়ু
নিঝুম কটাক্ষ ঢেলে জ্বালাবে জালিম
বরফ কণা, হারানো হারমোনিকা
ফণা তুলে দংশন-ছোবলে
জাগাবে জীবনের যাবতীয় শোক,
লুকানো জিজ্ঞাসু চোখ
রাঙা দৃষ্টি মেলে তাকাবে ভীষণ,
ভয় ভয় পরিতাপ জেঁকে বসে
শোনাবে সজল তিতিক্ষা কাহিনি।

আমাকে খুঁজবে না, খুঁজবে কি ভুলে?
সমস্ত সান্ত্বনা ভরে ঝিমন্ত ঝোলায়
ঝাপসা চোখ পাথুরে মণি দেখবে না
ননির খনি, লবণের কারবার,
নিভু নিভু চুলায় আর হবে না রান্না
সখের শালুন, রকমারি রেসিপি স্বাদ,
মধুর গান বাগানে ফুলের রেনু,
পোকামাকড় খাবে শুধু হৃদয়ের লাশ-
আমরা নিথর প্রাণ অবসন্ন মনে
জাবর কাটবো ভুলে বিগত বেদনা,
ফুটফুটে হাসি খেতে সেল্ফি তুলে
ফুটে থাকবো সেদিন অন্তর্জালে
অজান্তে ছায়াচিত্র এক প্রেমকামহীন।

Spread the love

সাহিত্য ডেস্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Next Post

সাংবাদিকদের ‘মুভমেন্ট পাস’ নিতে হবে না : আইজিপি

শনি এপ্রি ১৭ , ২০২১
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, সাংবাদিকদের লকডাউনে জরুরি প্রয়োজনে ‘মুভমেন্ট পাস’ নেওয়া লাগবে না। এই পাস শুধুমাত্র যারা কাজে বাইরে বের হবেন তাদের নিতে হবে। মঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ‘মুভমেন্ট পাস’ অ্যাপের উদ্বোধনকালে এ কথা জানান তিনি। আইজিপি বলেন, যাদের একান্তই বাইরে যাওয়া প্রয়োজন হবে, তাদের জন্য […]
সাংবাদিকদের

আরও পড়ুন